Breaking News

রুপই হয়েছিল তার জীবনের কাল , রাষ্ট্রের আদেশে তাঁকে প্রতিতা হতে হয়েছিল ,তিনি আম্রপালি জন্মেছিলেন এই ভারতে। ছিলেন সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং নর্তকী। Amrapali_আম্রপালি

কিভাবে আম্রপালি আমের নামকরণ করা হয় ?

আম্রপালি ছিলেন একজন অনিন্দ্য সুন্দরী নারী।  খুব সুন্দরী হওয়ার কারণে প্রায় ২৫০০ বছর আগে তাঁকে নগরবধূ বা পতিতা হতে হয়েছিল।


আম্রপালি জন্মেছিলেন আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে, এই ভারতে। তিনি ছিলেন সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং নর্তকী। তাঁর সেই রূপের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। আর সেই রুপই হয়েছিল তার জীবনের কাল। সেই রূপের জন্যই রাষ্ট্রের আদেশে তাঁকে প্রতিতা হতে হয়েছিল।


আম্রপালি বাস করতেন বৈশালী নগরে। বৈশালী ছিল প্রাচীন ভারতের একটি নগর। যেটি বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের অন্তর্গত।


মহানাম নামে এক ব্যক্তি শিশুকালে আম্রপালি কে আমগাছের নিচে কুড়িয়ে পান। তাঁর আসল মা-বাবার কোন পরিচয় জানা যায়নি। আম গাছের নিচে পাওয়া যায়, তাই তার পালিত বাবা-মা তার নাম রাখেন আম্রপালি। আম্র মানে আম, পালি অর্থ পাতা, তাই নাম রেখেছিল আম্রপালি। কিন্তু শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দিতেই আম্রপালিকে নিয়ে হইচই পড়ে যায় সারা শহরে। তাঁর রূপে চারপাশের মানুষ পাগল হয়ে ওঠে। দেশ-বিদেশের রাজা, রাজপুত্র থেকে সাধারণ মানুষ তাঁকে পাবার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। তাঁকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঝগড়া বিবাদের খবর আসতে থাকে। সবাই তাঁকে একনজর দেখতে চায়, তাঁকে বিয়ে করতে চায়। এতে আম্রপালির বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে যায়, তাঁরা বৈশালীর সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিকে এর সমাধানের জন্য অনুরোধ করেন।


সব শুনে বৈশালীর সকল ক্ষমতাবান ও ধনবান ব্যক্তিরা আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেন যে, আম্রপালি কে কেউ বিয়ে করতে পারবে না। সবাই যাতে আম্রপালির সান্নিধ্য পায়, তাই আম্রপালিকে হতে হবে একজন নগরবধূ, মানে সোজা বাংলায় পতিতা।


এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, ইতিহাসে কোন রাষ্ট্রের আদেশে, কোন নারীকে পতিতা  বানানো হয়েছে এমন উদাহরণ খুবই বিরল।




Amrapali_আম্রপালি



আম্রপালি সেই সভায় পাঁচটি শর্ত রাখেন।


১| নগরীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় তার ঘর হতে হবে।


২| তার মূল্য হবে প্রতি রাতের জন্য ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা।


৩| একবার মাত্র একজন তার গৃহে প্রবেশ করতে পারবে।


৪| শত্রু বা কোন অপরাধীর সন্ধানে, প্রয়োজনে সপ্তাহে সর্বোচ্চ একবার তার গৃহে প্রবেশ করা যাবে।


৫| তাঁর গৃহে কে এলেন আর কে গেলেন তা নিয়ে কোনো অনুসন্ধান করা যাবে না।


সবাই তার শর্ত মেনে নেয়।


প্রাচীন ভারতে মগধ রাজ্যের রাজা ছিলেন বিম্বিসার। শোনা যায় তাঁর ৫০০ পত্নী ছিল। একদিন নর্তকীদের নাচের এক অনুষ্ঠানে, তিনি এক নর্তকী নাচ দেখে বলেছিলেন, "এই নর্তকী বিশ্বসেরা।" বিম্বিসারের কথা শুনে তাঁর এক সভাসদ বলে ওঠেন, " মহারাজ এই নর্তকী আম্রপালির নখের যোগ্য নয়।"


বিম্বিসার ঐ সভাসদের কাছ থেকে আম্রপালির সম্পর্কে সব শোনার পর, আম্রপালিকে পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু সভাসদ বলেন তা সম্ভব নয়, কারণ তাহলে আমাদের যুদ্ধ করে বৈশালী রাজ্য জয় করতে হবে। তাছাড়া আম্রপালির দেখা পাওয়া খুব একটা সহজ নয়। দেশ-বিদেশের বহু রাজা, রাজপুত্ররা আম্রপালির প্রাসাদের সামনে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। কিন্তু কাউকে দেখা দেওয়া নির্ভর করে আম্রপালি ইচ্ছার উপরে।


বিম্বিসার সিদ্ধান্ত নিলেন, ছদ্মবেশে বৈশালী গিয়ে আম্রপালিকে দেখে আসবেন। কি এমন আছে সেই নারীর মধ্যে, যার জন্য এত মানুষ পাগল।


বহু অপেক্ষার পর আম্রপালির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান বিম্বিসার।  আম্রপালিকে দেখে রাজা চমকে উঠেন, এতো কোন নারী নয়, এতো সাক্ষাৎ পরি! এতরূপ কোন মানুষের কি করে হওয়া সম্ভব। প্রথম দেখাতেই আম্রপালি মগধের রাজা কে চিনতে পারেন। বিম্বিসার আম্রপালিকে তাঁর প্রধান রানী করার প্রস্তাব দিলেন।


আম্রপালি জানান তা সম্ভব নয়, তার রাজ্যের মানুষ এটা কখনোই মেনে নেবে না। উল্টে বহু মানুষের জীবন যাবে রক্তপাত হবে, তাই রাজাকে এখান থেকে চলে যেতেই হবে। রাজা বৈশালী  আক্রমণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, আম্রপালি  বলেন, বৈশালী আক্রমণ করলে তিনি তা কখনোই মেনে নেবেন না, তাই তার চলে যাওয়াই ভালো।


পরবর্তীতে বিম্বসারের পুত্র অজাতশত্রু, তার পিতা বিম্বসারকে বন্দী করেন এবং রাজা হন। রাজা হয়ে অজাতশত্রু, আম্রপালি কে পাওয়ার জন্য বৈশালী রাজ্য আক্রমণ করেন। কিন্তু পরাজিত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।


পরবর্তী ঘটনা বেশ চমকপ্রদ:


একদা গৌতম বুদ্ধ তার কয়েকজন শিষ্যকে সঙ্গেনিয়ে  বৈশালী নগরে আসেন। একদিন নিজের ঘরের বারান্দা থেকে এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখে, আম্রপালির তাকে ভালো লেগে যায়।  তিনি ভাবলেন দেশ-বিদেশের রাজারা আমাকে পাবার জন্য পাগল, আর এতো এক সামান্য মানুষ, একে আমার পেতেই হবে। আম্রপালি  গৌতম বুদ্ধের কাছে গিয়ে বললেন, " আমি এই সন্ন্যাসীকে মাত্র চার মাস আমার কাছে রাখতে চাই।" সবাই ভাবলেন গৌতম বুদ্ধ এমন প্রস্তাবে কখনই রাজি হবেন না, কারণ একজন সন্ন্যাসী কোন পতিতার কাছে থাকবেন এটা হতেই পারে না। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ রাজি হলেন, বললেন সে চারমাস মেয়েটির কাছে থাকলেও নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে, এতে আমি নিশ্চিত।


চার মাসে শেষ হলে, গৌতম বুদ্ধ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাবেন, কিন্তু তরুণ শ্রমণের কোন খবর নেই। তবে কি আম্রপালীর রুপের কাছে হেরে গেলেন শ্রমণ?


সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরুণ শ্রমণ ফিরে এলেন। আঁর পিছনে পিছনে এলের এক সুন্দরী নারী। সেই নারী ছিলেন আম্রপালি। আম্রপালি বুদ্ধের সামনে নতজানু হয়ে বললেন, " তরুণ শ্রমণকে প্রলুব্ধ করতে কোন চেষ্টাই বাকি রাখেনি তিনি, কিন্তু এই প্রথম কোনো পুরুষকে বশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, বৈশালীর নগর বধু আম্রপালি। তাই আজ সর্বস্ব ত্যাগ করে বুদ্ধের চরণে আশ্রয় নিতে চান তিনি।"


পরে সবকিছু দান করে বাকিজীবন গৌতম বুদ্ধের চরণেই কাটিয়ে দেন ইতিহাস বিখ্যাত সেই রমণী আম্রপালি।


এই আম্রপালির নামেই ১৯৭৮ সালে ভারতের আম গবেষকরা দশহরা ও নিলাম নামের দুটি আমের মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে এক নূতন জাতের আম উদ্ভাবন করেন এবং নাম রাখেন আম্রপালি।।


তথ্য সংগ্রহ:


ইতিহাস এবং ঐতিহ্য(গৌতম বুদ্ধের সময়কার)।


কোন মন্তব্য নেই